পাবনা মানসিক হাসপাতাল ও মানসিক রোগী

মানষিক সমস্যা-allhealthtipsbd.com

পাবনা মানসিক হাসপাতাল মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, অসুস্থ অথবা আহতকে ঔষধ ও শল্যচিকিৎসা এবং যথাযথ সেবাশুশ্রূষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এটি বাংলাদেশ এর একমাত্র মানসিক হাসপাতাল। পাবনা মানসিক হাসপাতালে সরকার অনুমোদিত একটি জনকল্যাণ সংস্থা রয়েছে। রোগীরা সুস্থ হওয়ার পর তাদের নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর খরচ এই সংস্থা বহন করে। জীবন রক্ষাকারী ঔষধপত্রও এই সংস্থা সরবরাহ করে থাকে। এছাড়াও হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সক্ষম রোগীদের চাকুরি বা কাজের ব্যবস্থাও এই সংস্থাটিই করে।

পাবনায় হেমায়েতপুরে মানসিক হাসপাতালটি শহরের সন্নিকটে আনুমানিক ৩ কিঃ মিঃপশ্চিমে অবস্থিত। এটি ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। পাবনা মানসিক হাসপাতাল মানসিক চিকিৎসায় দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। জানা যায়, এখানে রোগীদের প্রতিদিন গড় অবস্থানের সংখ্যা ৪২৫-৪৫০ জন।

সাড়ে তিন কোটির বেশি মানসিক রোগী’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ‘‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে উদ্যোগে ২০১১ সালে আমরা একটা জরিপ করেছি৷ তাতে দেখা গেছে মোট জনসংখ্যার ১৮ বছরের নীচে যাদের বয়স, তাদের মধ্যে শতকরা ১৮.১ ভাগ এবং ১৮ বছরের উপরে যাদের বয়স, তাদের মধ্যে ১৬.১ ভাগ কোনো না কোনোভাবে মানসিক রোগী৷ মোট জনসংখ্যার সাড়ে তিনকোটিরও বেশি মানসিক রোগী৷”

তবে তিনি জানান, ‘‘আমরা গুরুতর মানসিক রোগ যদি বিবেচনা করি তাহলে তা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭ ভাগ৷ আর যে কোনো মানসিক রোগীই চিকিত্‍সা পেলে পুরোপুরি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন৷”

মানসিক রোগ হল দুই ধরনের৷ একটা নিউরোসিস ও অন্যটি সাইক্রোসিস৷ নিউরোসিস হল মৃদু মানসিক রোগ৷ এক্ষেত্রে রোগী নিজেই বুঝতে পারেন৷ আর সাইক্রোসিস হল রোগী গায়েবি নির্দেশ শুনতে পান৷ সে বাস্তব জগতে নেই৷ এটা হলো জটিল মানসিক রোগ৷ যেমন ধরেন গায়েবি নির্দেশে তিনি নিজের সন্তানকে হত্যা করে ফেললেন৷ এক্ষেত্রে রোগী নিজে কিছু বুঝতে পারেন না৷ তার আশপাশের লোকের দায়িত্ব তাঁকে চিকিত্‍সকের কাছে নিয়ে যাওয়া৷

 

যে কোরণে মানসিক রোগ

চিকিত্‍সকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাংলাদেশে যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন, তাদের একটি অংশ আক্রান্ত হন বায়োলজিক্যাল এবং জেনেটিক কারণে৷ কিন্তু বড় একটি অংশ আক্রান্ত হন পারিবারিক এবং সামাজিক কারণে৷ নানা চাপ, দারিদ্র্য, সামাজিক এবং পারিবারিক অসঙ্গতি এর অন্যতম কারণ৷

বলা বাহুল্য, মানসিক রোগীদের চিকিত্‍সার জন্য ওষুধের পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও সঠিক সেবা যত্ন জরুরি৷ বাংলাদেশে পরিবার এবং সামজিক পরিবেশ এর প্রতিকূল অবস্থায় আছে৷ পরিবার মনে করে চিকিত্‍সা কেন্দ্রে পাঠাননোই যথেষ্ঠ৷ আর সামাজিকভাবে মানসিক রোগীদের হেয় করে দেখা হয়৷

ঢাকায় একজন মানসিক রোগীর অভিভাবক  বলেন, ‘‘আমার বড়ভাই সিজিনোফ্রিয়ায় আক্রান্ত৷ চিকিত্‍সায় তিনি স্বাভাবিক হলেও কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের অভাবে তাঁকে পুরোপুরি স্বাভাবি জীবনে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না৷”

তিনি বলেন, ‘‘পরিবারের সবাই ব্যস্ত থাকেন৷ আবার নিয়মিত কাউন্সেলিং-এরও ব্যবস্থা নেই৷” প্রসঙ্গত, পাবনা মানসিক হাসপাতালে কাউন্সেলিং বিশেষজ্ঞ নেই৷ নার্সের ২০টি পদ খালি৷

চিকিত্‍সা ব্যবস্থা কেমন?

বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিত্‍সার জন্য একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালটি পাবানায়৷ ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে বর্তমানে ডাক্তার আছেন মাত্র চারজন৷ এছাড়া দু’জন চিকিত্‍সক বাইরের সরকারি হাসপাতাল থেকে আসে৷ কিন্তু প্রয়োজন ৩০ জন চিকিত্‍সকের৷ হাসপাতালে কর্মচারীদের জন্য ৪৯২টি পদ থাকলেও বর্তমানে কাজ করছেন ৩৬৬ জন৷

এর বাইরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট এবং প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে মানসিক রোগ চিকিত্‍সা বিভাগ আছে৷

পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিয়ে ভুক্তভোগীদের অনেক অভিযোগ আছে৷ তাদের কথা, ‘‘এখানে চিকিত্‍সা নিতে গেলে রোগীর মানসিক অবস্থা আরো খারাপ হয়৷ এমনকি সুস্থ মানুষকেও ষড়যন্ত্র করে এই হাসপাতালে ভর্তির অভিযোগ আছে৷’

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. তন্ময় প্রকাশ বড়ুয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোনো বক্তব্য জানা যায়নি৷ তবে পাবনার স্থানীয় সাংবাদিক  জানান, ‘‘এখানে জনবলের সংকট তো আছেই৷ তার সঙ্গে অবহেলা গিয়ে পৌঁছেছে চরম পর্যায়ে৷ রোগীদের শুধুমাত্র ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়৷ আর কোনো চিকিত্‍সা বলতে নেই৷ রোগীদের বিনোদন, ক্রীড়া বা তাদের সেবার কোনো বালাই নেই৷”

আমাদের যা করতে হবে

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আতিকুল হক মজুমদার  বলেন, ‘‘মানসিক রোগী এই শব্দটিই যেখানে পরিহারের কথা উঠছে সেখানে আমাদের দেশে এখনো মানসিক রোগীদের পাগল বলা হয়৷ আর মানসিক রোগাক্রান্তকে হেয় করে দেখা হয়৷ এব্যাপরে আমরা সচেতন না হলে শুধু চিকিত্‍সায় কাজ হবে না৷”

তিনি আরো জানান, ‘‘মানসিক রোগীকে জানান যাবে না যে সে মানসিক রোগী৷ তাকে আত্মবিশ্বাস বা অন্যকিছু বলে চিকিত্‍সা করাতে হবে৷ জাপান তাই করছে৷ তাই আমি বলি, দেশে কোনো মানসিক রোগী নেই৷”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, সারা বিশ্বের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে একজন মানসিক অসুস্থতায় ভোগেন৷ ডা. আতিকুল হক মজুমদারের মতে, আধুনিক এই জীবনে তাই শুধু চিকিত্‍সা নয়, মানসিক রোগে কেউ যাতে আক্রান্ত না হন তার জন্য পরিবার ও সমাজকে সহনশীল ও প্রীতিময় হতে হবে৷

About নওরীন জাহান

View all posts by নওরীন জাহান →