পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সার কি এ থেকে বাঁচতে হলে যা করতে হবে

পুরুষ স্বাস্থ্য-allhealthtipsbd.com

প্রস্টেট ক্যান্সার বহু পুরনো রোগ। তবে ইদানিং যে হারে বাড়ছে, তাতে চিন্তায় পুরুষরা।কারণ প্রস্টেট ক্যান্সার শুধু তাঁদেরই হতে পারে। আমেরিকান ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট-এর গবেষণা অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যান্সারের পরই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী প্রস্টেট ক্যান্সারের রোগীরা। এশিয়াতে ব্লাড ক্যানসার এর পরে হল প্রস্টেট ক্যান্সার। এটি অনেক ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। মৃত্যুঝুঁকি বেরে যেতে পারে ১০ গুন।

এরমধ্যেই সাম্প্রতিক এক গবেষণাতে দেখা গেছে নতুন তথ্য। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গবেষকদের মতে, প্রস্টেট ক্যান্সার রুখতে একমাত্র উপায় ইজাকুলেশন।

তাঁদের মতে, দিনে কমপক্ষে একবার ইজাকুলেট করেন, তাঁদের এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যে সকল পুরুষরা মাসে কমপক্ষে ২১ বার ইজাকুলেট করেন, তাদের প্রস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাবনা ১৯% কমে যায়। তবে এক্ষেত্রে বয়স একটি ফ্যাক্টর। বলা হচ্ছে, যাঁদের বয়স বিশ বা ত্রিশের ঘরে, এই শর্ত তাঁদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

শুধু প্রস্টেট ক্যান্সারই নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, মাসে ৪ বারের কম ইজাকুলেশন করা পুরুষদের অন্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়।তবে, ইজাকুলেশন করতে গিয়ে যৌন আসক্তি দেখা দিলে, তা মানসিক রোগের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

 

প্রোস্টেট ক্যান্সার কি?

ক্যান্সার বা ম্যালিগ্যান্ট টিউমার হচ্ছে শরীরের কোনো অংশের বা অঙ্গের কিছু কোষের এমন পরিবর্তন যেখানে কোষগুলো স্বাধীন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে এবং সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে, শরীরের অন্য অংশে বা অঙ্গসমূহে এই কোষসমূহের ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকে। স্বাভাবিকভাবে শরীরের যেকোনো কোষের বিভাজন ও বৃদ্ধি আমাদের শরীর প্রাকৃতিক নিয়মেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে৷ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। সংখ্যায় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রোস্টেট স্ফীত হতে থাকে, প্রস্রাবের প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে৷ আবার খুব ছোট টিউমার কোনো লক্ষণ সৃষ্টির আগেই শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে -ফলে হতে পারে জীবননাশের মতো ঝুঁকির কারণও।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণ: 

প্রোস্টেট ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় এখনো সম্ভব হয়নি, তবে কতগুলো বিষয় লক্ষ করা গেছে যেগুলো প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলোকে বিপদের কারণ হিসেবে মনে করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-

  • বয়স যত বেশি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বেশি।•    প্রোস্টেট ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস৷
  • প্রোস্টেট ক্যান্সারের কিছু জেনেটিক কারণও আজকাল আলোচিত হচ্ছে।
  • প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ ও এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা না করা।
  • খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চর্বি ও আমিষ খাবারের সংযোজন। সিগারেট, তামাক সেবন।
  • পুরুষ হরমোন (টেস্টোস্টেরনের) উপস্থিতি প্রোস্টেট ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তারে সাহায্য করে থাকে।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণগুলিঃ 

৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে অসুস্থতার প্রাথমিক অবস্থায় প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীর কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই কেবল নিয়মিত চেকআপ করে এ রোগ নির্ণয় সম্ভব। সাধারণভাবে প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে –

  • প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবের চাপ হলে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা।
  • প্রস্রাবে রক্ত আসা,রক্ত খালি চোখে দেখা যেতে পারে আবার কেবল প্রস্রাবের পরীক্ষায় পাওয়া যেতেপারে।
  • বীর্যের সঙ্গে রক্ত আসা।
  • হাড়ের ব্যথা বিশেষত কোমরের বা মেরুদণ্ডের হাড়ের ব্যথাসহ নানাবিধ উপসর্গ থাকতে পারে।

এখানে   বলে রাখা ভালো, এসব উপসর্গ থাকলেই প্রোস্টেট ক্যান্সার হয়েছে তা ভাবা ঠিক নয়-কারণ প্রোস্টেট ক্যান্সার ব্যতীত অন্য আরো কিছু অসুস্থতায় এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের মূত্রনালী লক্ষণ

মূত্রাশয় ও মূত্রনালীতে প্রস্টেট গ্রন্থির প্রক্সিমেটিনের কারণে প্রস্টেট ক্যান্সারের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আকার ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে, টিউমারটি প্রস্রাবের প্রবাহকে বাধা দিতে পারে এবং মূত্রনালীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রস্রাবের সাথে সম্পর্কিত কিছু প্রস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণগুলি অন্তর্ভুক্ত করে:

  • প্রস্রাবের সময় জ্বলন্ত অনুভূতি বা ব্যথা করা।
  • মূত্রত্যাগের সময় সমস্যাটি শুরু হওয়া এবং বন্ধ করার সময় অসুবিধা বোধ করা।
  • ঘন ঘন রাতে প্রস্রাব করা (urges)
  • মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণে হ্রাস পাওয়া।
  • প্রস্রাবের প্রবাহ বা বেগ হ্রাস পাওয়া।
  • প্রস্রাবের সাথে রক্ত পড়া ​​(হেম্যাটুরিয়া) ।

অন্যান্য প্রস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি

প্রোস্টেট ক্যান্সার হাড়ের কাছে (মেটাটেসাইজ) ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি ক্যান্সার মেরুদন্ডে ছড়িয়ে পড়ে তবে এটি মেরুদন্ডী স্নায়ুতে চাপতে পারে। অন্যান্য প্রস্টেট ক্যান্সারের উপসর্গগুলি অন্তর্ভুক্ত করে:

  • বীর্যে রক্ত পাওয়া।
  • ইরেক্টিল ডিসফাংশন।
  • বেদনাদায়ক নির্গমন।
  • পায়ে বা স্ফুলিঙ্গ এলাকায় ফোলা।
  • হিপস, পা বা পায়ের মধ্যে ব্যথা বা অসাড় হওয়া।
  • হাড়ের ব্যথা যেটি ভাল হয় না, বা হাড় ফ্র্যাকচার।

প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ:

প্রোস্টেট ক্যান্সারের সঠিক কারণ এখনো নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তাই এ রোগের প্রতিরোধ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে সম্ভাব্য কারণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হলে বা এড়িয়ে চললে উপকার পাওয়া সম্ভব। যেমন –

  • ধূমপান বর্জন।
  • চর্বিজাতীয় খাবার, আমিষ খাবার পরিমিত খাওয়া।
  • খাদ্যতালিকায় টমেটো, গাজর, তরমুজ, সয়াবিনজাত খাদ্যর নিয়মিত সংযোজন প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
  • ভিটামিন সি ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার এ রোগের ঝুঁকি কমায়।
  • প্রোস্টেট ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে বয়স ৪০ পেরুলেই বা কোনো লক্ষণ অনুভব করলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ও নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করানো৷
  • প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ হলে সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা নেয়া৷
  • কোনো প্রয়োজনে শরীরের বাইরে থেকে পুরুষ হরমোন (টেষ্টোস্টেরন) ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিৎ।

চিকিৎসা:

  • প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে – প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়।
  • রোগীর উপসর্গ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা নিয়মিত শারীরিক পরিক্ষার মাধ্যমে যদি প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা  দেয়া যায়, তবে চিকিৎসা  থেকে ভালো ফল লাভ সম্ভব। অর্থাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

 

About নওরীন জাহান

View all posts by নওরীন জাহান →