চুলকানি, খোসপাঁচড়া, একজিমাসহ  অসস্থিকর ত্বকের রোগ থেকে বাচার কিছু সহজ উপায়

চরমরোগ-allhealthtipsbd.com

খুব সাধারণ কিন্তু বিরক্তিকর ও অসহ্যকর কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো চুলকানি। চুলকানি এমন একটি সমস্যার নাম যা কিনা আপনাকে মাঝে মধ্যে এতোটাই অপ্রস্তুত করে ফেলে যেটার ব্যাখ্যা হয়তো বলে বোঝানো সম্ভব না। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন ও হতে হয় যে লোকের তোয়াক্কা না করে আপনাকে এক ঘর লোকের সামনেই চুলকাতে বাধ্য হতে হয়।

ত্বক মানুষের শরীরকে যেমন বাইরের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করে, তেমনি মানুষের সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও একে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ত্বকের অসুখ মানে একই সঙ্গে অসুস্থতা ও সৌন্দর্যহানি।

শরীর সুস্থ থাকলেও কোনো ব্যক্তির ত্বকে ক্ষত বা দাগ তৈরি হলে তিনি অস্বস্তিতে ভোগেন। আবার ত্বক সাধারণভাবে দেখতে সুন্দর হলেও এটি যদি শরীরের ভেতরের ভাইটাল অঙ্গগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলেও ওই মানুষ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই ত্বকের সৌন্দর্য ও সুস্থতা দুটোই অত্যন্ত জরুরি।

ঋতুভেদে ত্বকের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ পরিবর্তনের কারণে কখনো কখনো ত্বকে অসুখও দেখা দেয়। যেমন-আমাদের দেশে সাধারণত সারা বছরই বাতাসে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি যথেষ্ট থাকে। কিন্তু শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়। এ কারণে ত্বকের উপরি অংশের কোষ থেকে সহজেই জলীয় অংশ শোষিত হয়ে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। ত্বক শুষ্ক হওয়ার কারণে এটির স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়া (বায়োলজিক্যাল অ্যাপটিভিটি) বাধাগ্রস্ত হয়।

সময় ত্বকে আগের থাকা কিছু রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে এবং কিছু কিছু নতুন রোগ দেখা দিতে পারে। যেমন-

জেরোটিক একজিমাঃ

জেরোটিক ডার্মাটাইটিস বা একজিমা অ্যাসটিয়াটোটিক ডার্মাটাইটিস, একজিমা ক্র্যাকোলি বা শীতকালীন চুলকানি নামেও পরিচিত। এটি পুরো শরীরে হতে পারে। তবে হাতে বেশি হয়। ভীষণ চুলকায়। আক্রান্ত স্থান শুষ্ক, ফাঁটা ফাঁটা ও লালচে দেখায়। তবে ফোঁসকা পড়ে না। বয়স্করা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন।

চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর। কারো কারো ক্ষেত্রে সাবান ব্যবহারে হয়। সে ক্ষেত্রে সাবানের বিকল্প ব্যবহার করতে হয়। লোশনের ব্যবহার সাধারণভাবে নিষেধ করা হয়। তবে গোসলের পর পুরো শরীরে ভ্যাসলিন মাখলে দীর্ঘ সময় ত্বকে জলীয়বাষ্প আটকে থাকে বলে উপকার পাওয়া যায়। যাঁদের প্রকোপ বেশি হয় তাঁদের ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ব্যবহার করার দরকার হতে পারে।

ডার্মাটাইটিসঃ

সহজভাবে বললে, ডার্মাটাইটিস হচ্ছে ত্বকের প্রদাহ। এটি বহু কারণে হতে পারে। কারণের ওপর নির্ভর করে এর লক্ষণ। সাধারণত আক্রান্ত ত্বক চুলকায়, ফুলে যায় ও লালচে বর্ণ ধারণ করে। কখনো কখনো ফোঁসকা দেখা যায়।

যেকোনো বয়সের যে কারো এ রোগ হতে পারে। বেশি হয় শিশুদের। যাঁদের ডার্মাটাইটিসের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অ্যালার্জি ও অ্যাজমায় আক্রান্তদের একজিমা হতে পারে।

অনেক ধরনের চিকিৎসা আছে। কর্টিকোস্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার, ক্যালসিনিউরিন ইনহিবিটর ক্রিম বা লোশন ব্যবহার ও ফটোথেরাপির মাধ্যমেই চিকিৎসা বেশি দেওয়া হয়। সাধারণ সতর্কতা হিসেবে রোগীকে সুতি কাপড় পরিধান করতে হয়, হালকা গরম পানিতে গোসল করতে হয়, না চুলকাতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

অ্যাটপিক একজিমাঃ

এটিও এক ধরনের ডার্মাটাইটিস, যাতে ত্বক চুলকায় ও লালচে হয়। চুলকানি রাতে বেশি হয়। শিশুদের বেশি হয়। তবে যেকোনো বয়সে হতে পারে। এ রোগটি সহজে সারে না। একবার সারলেও আবার হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুদিন পরপর হতে দেখা যায়। অ্যাজমা ও জ্বরে যাঁরা বেশি ভোগেন, তাঁদের বেশি হয়।

এখন পর্যন্ত খুব ভালো চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা হচ্ছে মূলত ক্ষতস্থানে মেডিকেটেড ক্রিম ও অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করা। সাবান ও ডিটারজেন্ট এবং যেসব বস্তুর সংস্পর্শে বেশি হয়, তা এড়িয়ে চলা। ক্ষতস্থান থেকে টিসু নিয়ে পরীক্ষা করে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করার প্রয়োজন হতে পারে।

ইরাথ্রোসিসঃ

এটি একনি বা ব্রণের মতো। এতে ক্ষতস্থান লালচে হয়ে যায়, ব্রণের মতো থাকে দীর্ঘদিন। চিকিৎসা না করা হলে দিনে দিনে প্রকোপ বাড়ে। কখনো কখনো একবার হয়ে সেরে গিয়ে আবার হয়। বেশি আক্রান্ত হয় মুখের ত্বক। ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সে বেশি হতে দেখা যায়। মহিলাদের বেশি হয়। অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার, সূর্যালোক, অ্যালকোহলে বেশি হয়।

সোরিয়াসিসঃ

ছোঁয়াচে নয়, সাধারণত বংশগত কারণে হয়। রোগটি মূলত শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত (অটোইমিউন) অসুখ, যেখানে ত্বকের কোষের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়।

সাধারণত চুলকায়। কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যথাও হয়। চুলকানোর কারণে কিছু ক্ষেত্রে রক্তপাতও হয়। বেশি হয় হাঁটু, কনুই, হাত ও পায়ের পাতা, নখ, পিঠ, যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথের ভাঁজে। রোগটি যেকোনো বয়সে হতে পারে।

চিকিৎসা খুব সহজ নয়। ফটোথেরাপি ও লেজার প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া মুখে সেবনের ওষুধ হিসেবে সাইক্লোস্পোরিন, রেটিনয়েড ওষুধ ইত্যাদি প্রয়োগ করা হয়।

লাইকেন প্ল্যানাসঃ

ত্বক ও মিউকাস আবরণীর (মুখের ভেতরের ঝিল্লি) এক ধরনের প্রদাহ লাইকেন প্ল্যানাস নামে পরিচিত। ত্বকের লাইনেক প্ল্যানাসে ত্বক কিছু বেগুনি রং ধারণ করে। প্রায়ই চুলকায়। মুখের ভেতরে বা যৌনাঙ্গে হলেও কিছু ক্ষেত্রে চুলকায়, ব্যথা করে এবং ক্ষতস্থান সাদা হয়ে যায়।

এ রোগটিও শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত অসুখে হয়। এ ছাড়া আর কী কারণে হয় তা এখনো অজানা। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় লাইকেন প্ল্যানাস পরবর্তী সময়ে ত্বকের ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়। ওষুধ হিসেবে কর্টিকোস্টেরয়েড, রেটিনয়েড, ননস্টেরয়ডাল ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট, অ্যান্টিহিস্টামিন, ফটোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়।

স্ক্যাবিসঃ

এটি খোসপাঁচড়া বা সাধারণ চুলকানি নামেও পরিচিত। রোগটি ছোঁয়াচে। সহজেই একজন থেকে অন্যজন আক্রান্ত হয়। চুলকানি রাতের দিকে বেশি হয়। পুরো ত্বকে ফোসকার মতো পড়ে। বেশি হয় আঙুলের ফাঁকে, কোমরে, কনুইয়ের ভাঁজে, স্তনের আশপাশে, যৌনাঙ্গে। শিশুদের ক্ষেত্রে মাথার চাঁদিতে, মুখে, কাঁধেও হতে দেখা যায়।

এ ছাড়া আরো অনেক ধরনের ত্বকের রোগও দেখা যায়ঃ

আবার ত্বকের কিছু অসুখ আবহাওয়ার পরিবর্তনের জন্য না হয়ে কসমেটিক বা প্রসাধনীর অতিরিক্ত ব্যবহারেও হয়। শীতকালে প্রসাধনী বেশি ব্যবহার করা হয় বলে এ সময় এ ধরনের চর্মরোগ বেশি দেখা দেয়। যেমন-কসমেটিক ডার্মাটাইটিস। এ ক্ষেত্রে মুখের দাগ বিশেষ করে মেলেজমা, একিনিক ডার্মাটাইসিস, পেরিঅরবিটাল ডার্মাটাইটিসসহ মুখে ছোট ছোট দানাদার চুলকানি হয় ও ত্বক লাল হয়ে যায়, ফুলে ওঠে এবং ছোপ ছোপ সাদা বা কালো দাগ মুখে ও শরীরের অন্যান্য অংশে দেখা যায়।

ইসব অসস্থিকর ত্বকের রোগ থেকে বাচার কিছু সহজ উপায়ঃ

শীতকালে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার কারণে সব সময় তেল, মলম বা ক্রিমজাতীয় পদার্থের মাধ্যমে চামড়াকে পর্যাপ্ত পরিমাণে হাইড্রেটেট বা সতেজ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাবান, ডেটল, স্যাভলন বা অন্যান্য ডিটারজেন্টজাতীয় পদার্থ ত্বকে কম লাগানো ভালো।

টার-জাতীয় অথবা অন্যান্য কিছু মেডিকেটেট শ্যাম্পু এবং বডিওয়াশ বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল সরাসরি ব্যবহার করা যায়। ভালো মানের বডিলোশন ব্যবহার করা যায়। এগুলো চামড়াকে মসৃণ রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজের লোশন এক বা দুবার ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। যেমন স্ক্যাবিসের জন্য পারমিথ্রিন বা স্কেবিসাইডাল লোশন ব্যবহার করা যায়। সোরিয়াসিসের জন্য টার-জাতীয় শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায় এবং ট্রপিক্যাল স্টেরয়েড অথবা সেলি সাইলিক এসিড অথবা ইউরিয়াজাতীয় মলম অথবা ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও ট্রপিক্যাল অথবা সিস্টেসিক ওষুধ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে।

কসমেটিকজনিত দাগ পড়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সব মানুষের জন্য সব কিছু সমভাবে প্রযোজ্য নয়। এটি দেশি বা বিদেশি, কম দামি কী বেশি দামি সেটি কোনো মুখ্য বিষয় নয়। একটি কসমেটিক একজনের ত্বকের সঙ্গে খুব সহজেই মানানসই বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যা অন্যজনের ক্ষেত্রে ত্বকে রি-অ্যাকশন হতে পারে। রি-অ্যাকশন হলে ওই কসমেটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে কিছু ট্রপিক্যাল বা স্থানীয়ভাবে ত্বকে ব্যবহারের জন্য খুব মাইল্ড স্টেরয়েড জাতীয় ক্রিম ব্যবহার করতে হবে। ওষুধ হিসেবে এন্টিহিস্টামিন সেবন করা যেতে পারে।

 ঘরোয়া পদ্ধতিতেই  চুলকানি সমস্যার সমাধানঃ

আসুন দেখা যাক কিভাবে ঘরোয়া পদ্ধতিতেই আপনি আপনার চুলকানি সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

আপেল সিডার ভিনেগারঃ
চুলকানি সারানোর একটি সহজ উপায় হলো আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার। সামান্য কয়েক ফোঁটা ভিনেগার একটি তুলার বলে নিয়ে আপনার শরীরের চুলকানো অংশটিতে লাগিয়ে দিন। দ্রুত চুলকানি কমে যাবে।

পেট্রোলিয়াম জেলিঃ
আপনার ত্বক যদি হয় সংবেদনশীল হয় তাহলে পেট্রোলিয়াম জেলি হচ্ছে চুলকানি সারানোর সবচেয়ে উত্তম উপায়। পেট্রোলিয়াম জেলিতে কোন ক্ষতিকারক উপাদান না থাকায় এটি আপনার ত্বকের কোন সমস্যা না করেই চুলকানি সাড়িয়ে তুলবে।

নারিকেল তেলঃ
চুলকানি সারানোর আরও একটি সহজ ও সস্তা উপায় হচ্ছে নারিকেল তেল লাগানো। নারিকেল তেলের পুষ্টি উপাদান আপনার ত্বকের কোন ক্ষতি সাধন না করেই চুলকানি বন্ধ করতে সাহায্য করবে।

লেবুঃ
লেবুর ভিটামিন সি কন্টেন্ট ও ব্লিচিং প্রোপার্টিজ ত্বকের চুলকানি সারাতে খুব কার্যকরী। শরীরে চুলকানি হলে একটি লেবু দুভাগে কেটে আপনার চুলকানি জায়গায় লাগান এবং শুকিয়ে ফেলুন। এতেই চুলকানি কমে যাবে।

ময়েশ্চারাইজিং লোশনঃ
 ত্বকে চুলকানি, খোসপাঁচড়া, একজিমাসহ নানা ধরণের সমস্যা বেড়ে গেলে। শীতে প্রতিদিন হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করার পর যেকোন ধরণের ময়েশ্চারাইজিং লোশন শরীরে ব্যবহার করতে পারেন।

স্কিন বিশেষজ্ঞ আপনার হাত-পায়ের ফাটা ক্ষতস্থানের তীব্রতা অনুযায়ী হালকা, মধ্যম বা তীব্রমাত্রার ষ্টেরয়েড জাতীয় মলম বা ক্রিম ব্যবহার করতে দেবেন। দিনে ২ বার এ ধরণের ক্রিম ২ সপ্তাহ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন- ব্যবহার করতে হবে। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ব্যতীত ষ্টেরয়েড ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ছাড়া শীতে মহিলারা ত্বক নিয়ে বেশী সংবেদনশীল থাকেন। মহিলারাও একই ধরণের ত্বক পরিচর্যা করতে পারেন। তবে মহিলাদের শীতে অয়েল বেজড কসমেটিকস ব্যবহার করা ভালো। এরপরও যদি আপনার ত্বকের সমস্যা থেকে যায় তাহলে আপনার নিকটস্থ কোন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

About ডক্টর নাসরিন সুলতানা

Asscociate Professor, Dept. of Gynae & Obs, Shaheed Tazuddin Ahmad Medical College & Hospital ,Gazipur Gynaecology and Obstetrics (Pregnancy, Menstrual, Uterus, Female)

View all posts by ডক্টর নাসরিন সুলতানা →