শিশুর শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ ত্বক নরম ও কোমল করতে শিশুর ত্বকের যত্ন

শিশু স্বাস্থ্য-allhealthtipsbd.com

শিশুদের সুস্থতায় মায়েরা খুব সচেতন থাকেন। আর এক্ষেত্রে বাচ্চাদের ত্বকের যত্ন খুব জরুরি। তবে আমরা না জেনে শিশুর ত্বকের যত্নে বেশকিছু ভুল করি। এর প্রভাবে বাচ্চাদের ত্বকে রুক্ষতা, র‍্যাশ সহ নানান সমস্যা দেখা দেয়। তাই দেখে নিন শিশুর ত্বকের যত্নে যেসব সচেতনতা জরুরি-

শিশুর ত্বকের যত্নে যেসব সচেতনতা জরুরিঃ-

১) বেশি গোসল করানো অথবা পরিষ্কার করা
প্রতিদিন সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার না করাই ভালো। গোসলের শেষে নরম শুকনো সুতি কাপড় দিয়ে দ্রুত ভালোভাবে পানি মুছে ফেলতে হবে। শরীরের ভাঁজগুলোতে যেন পানি লেগে না থাকে। কারণ, এ থেকে ছত্রাক সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।

বাচ্চার ত্বক সংবেদনশীল হওয়ায় বার বার ধোয়া শিশুর ত্বক শুষ্ক এবং রুক্ষ করে ফেলবে। তাই প্রয়োজন ছাড়া বার বার বাচ্চার ত্বক পরিষ্কার করার অভ্যাস বাদ দিন।

২) ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে গোসল/পরিষ্কার কম করানো
অনেকের ধারণা বাচ্চাদের নিয়মিত গোসল করাবার দরকার নেই। দেখা যাচ্ছে দু-তিন দিন পর পর একবার গোসল করাচ্ছেন। বাকি সময় বড়জোর গা মুছে দিচ্ছেন। বাচ্চা সারাদিন ঘরে থাকলেও ঘাম ময়লা তো জমবেই। তাই গোসল নিয়মিত বাচ্চাকে গোসল করান। ঠান্ডার দিনে বাচ্চাকে হাল্কা গরম পানি দিয়ে গোসল করাবেন। তবে এটা অবেলায় করাবেন না। রোদ উঠে যাবার পর থেকে দুপুর হবার আগ পর্যন্ত গোসল করানো সবচেয়ে ভালো।

৩) বড়দের সাবান ব্যবহার
আমরা অনেকেই বাচ্চাকে প্রতিদিন বড়দের সাবান দিয়ে গোসল করাই। কিন্তু বড়দের সাবানে থাকে অতিরিক্ত ক্ষারীয় উপাদান। শিশুদের ত্বক বড়দের তুলনায় ৫ গুণ পাতলা। বেবির সংবেদনশীল ত্বকে বড়দের সাবান ব্যবহারে শিশুর ত্বকে র‍্যাশ, রুক্ষ, অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। শিশুর ত্বকে উপযোগী সাবান (যা অবশ্যই ময়েশ্চারাইজারযুক্ত হতে হবে) ব্যবহার করুন।

৪) বড়দের প্রোডাক্ট ব্যবহার করানো
অনেকে বড়দের লোশন শিশুদের ব্যবহার করেন। আপনি হয়তো জানেন না, বড়দের প্রসাধন সামগ্রীতে চড়া মাত্রায় প্রিজারভেটিভ, পারফিউম, এবং এলারজেন উপাদান থাকে। যা আপনার বাচ্চার কোমল ত্বকের জন্য কোন অবস্থাতেই উপযোগী নয়।

৫) অপরিশোধিত তেল মাখানো
আগের দিনে সরিষার তেল, তিলের তেল ইত্যাদি বাচ্চাদের মাখিয়ে তারপর গোসল করানো হত। এটা বাচ্চাদের জন্য ভালো। কারণ, গোসলের আগে তেল ম্যাসাজ করা বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্বাভাবিক গ্রোথের জন্য উপকারী। কিন্তু আমাদের দেশের এই তেলগুলো অপরিশোধিত।

এসব তেলে থাকতে পারে ঝাঁজালো উপাদান এবং উচ্চমাত্রায় এসিড ভ্যালু যা বাচ্চার ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। তাই ব্যবহার করুন এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ অলিভ অয়েল।

শিশুর শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ ত্বক নরম ও কোমল করার উপায়ঃ-

বড়দের তুলনায় শিশুদের ত্বক খুব নাজুক ও স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। যার কারণে শীতের আর্দ্র আবহাওয়াতে শিশুর ত্বক শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। শুষ্ক চামড়া বাচ্চাদের বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দেয়। তাই শীতের এই সময়টাতে শিশুর ত্বকের যত্নের ব্যাপারে হতে হবে সতর্ক ও মনোযোগী-

১।গোসল
শিশুর শরীরের তেল ও ময়লা ধুয়ে ফেলতে গোসল করানো জরুরী। গোসল করানোর সময় সুগন্ধিবিহীন বাচ্চাদের সাবান ব্যবহার করুন। খেয়াল রাখবেন শীতে যেন বাচ্চাদের শরীরে বড়দের সাবান লাগানো না হয়। গোসলের জন্য কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। শিশুর গোসলের জন্য ১০ মিনিটের বেশি সময় নিবেন না। গোসল শেষে দ্রুত শরীর ও মাথা ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে।

২।ময়েশ্চারাইজ
শীতে আপনার বাচ্চার ত্বকের যত্নে সব থেকে যেটি বেশি জরুরী সেটা হল ময়েশ্চারাইজার। শিশুকে গোসল করানোর পর কোমল কোন টাওয়েল দিয়ে শরীর মুছিয়ে তারপর মশ্চারাইজার লাগান। তবে এটি লাগানোর আগে নিশ্চিত হোন সেটি যাতে সুগন্ধি, অ্যালকোহল ও অন্যান্য কেমিক্যাল বিহীন হয়। শীতে শিশুর ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল ও ভিটামিন ই সমৃদ্ধ তেল ব্যবহার করতে পারেন।

৩।ঘন ঘন ডায়পার পরিবর্তন
শীতের আদ্রতা থেকে আপনার শিশুর ত্বক বাঁচাতে ঘন ঘন ডায়পার পরিবর্তন করুন। ভেজা ডায়পার যতবেশি আপনার শিশুর ত্বকের সংস্পর্শে থাকবে ত্বকে ততবেশি বুটি ফুসকুড়ি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তাই শিশুর ডায়পার ভেজা অবস্থায় বেশিক্ষণ পড়িয়ে রাখবে না।

৪।সুতি কাপড় ব্যবহার
শিশুর ত্বকের অভ্যন্তরে বাতাস চলাচল করতে সুতি কাপড় ব্যবহার করুন। এমনকি আপনার শিশুর ত্বক নরম রাখতেও সুতি কাপড় খুব কাজের।

৫।পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার
আপনার ছোট্ট সোনামণির ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখতে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন। গোসলের পর সামান্য পরিমাণ পেট্রোলিয়াম জেলি হাতে নিয়ে হালকা করে শিশুর ত্বকে লাগিয়ে দিন।

৬।অ্যালোভেরা জেল
শিশুর ত্বক শীতে সুরক্ষা দিতে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করতে পারেন। অ্যালোভেরা কাণ্ড ভেঙ্গে সেখান থেকে জেল নিয়ে ত্বকের শুষ্ক জায়গায় লাগিয়ে দেখুন ত্বক নরম ও কোমল থাকবে।

বয়স ভেদে শিশুর ত্বকের যত্নঃ-

বয়স ভেদে শিশুর ত্বকের যত্নও নিতে হয় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। আমরা না জেনে শিশুর ত্বকের যত্নে বেশকিছু ভুল করি। এর প্রভাবে ত্বকে রুক্ষতা, র‍্যাশ সহ নানান সমস্যা দেখা দেয়। তাই আমরা জানব বয়স ভেদে কিভাবে ত্বকের যত্ন নিতে হয়।

২ বছরের কম বয়সী শিশুঃ
শীতকালে এই বয়সের শিশুদের প্রতিদিন গোসল করানোর প্রয়োজন নেই। এক দিন পর পর গোসল করালেই শিশুর ত্বক ভালো থাকবে। শিশুর গোসলের জন্য কুসুমগরম পানি ব্যবহার করুন। গোসলের পর জলপাই তেল বা শিশুর ত্বকের উপযোগী হালকা কোনো ময়েশ্চারাইজিং লোশন লাগিয়ে দিতে পারেন।

২ থেকে ৭ বছরের শিশুঃ
এই বয়সী শিশুরা বেশি খেলাধুলা করে। বাইরে গিয়ে খেলাধুলা শুরু করা এবং অন্যদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের উপযুক্ত সময় এটি। আজকাল অনেক শিশুই ৩ বছর বয়স থেকে প্রাক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে যেতে শুরু করে। এই বয়সী শিশুদের সবকিছুতেই আগ্রহ বেশি। জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি ওদের। দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত শিশুদের বাধা দেবেন না। খেলা শেষে ও বাইরে থেকে ফেরার পর অবশ্যই হাত-পা পরিষ্কার করিয়ে দিন। খেলার সময় শিশু ঘেমে যাচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখুন। ঘেমে গেলে বা গরম লাগলে ভারী শীতের পোশাক খুলে দিন। ঘাম মুছেও দিতে হবে। ওদের অবশ্যই কুসুমগরম পানি দিয়ে প্রতিদিন গোসল করাতে হবে। গোসলের সময় সাবানও ব্যবহার করা যাবে। তবে সাবানটি হতে হবে শিশুর ত্বকের উপযোগী। গোসলের পর জলপাই তেল বা শিশুদের উপযোগী লোশন লাগিয়ে দিন।

৮ থেকে ১২ বছরের শিশুঃ
এই বয়সী শিশু অনেকটাই নিজের যত্ন নিতে শিখে যায়। ঘেমে গেলে শরীর মুছে নেওয়া বা ভারী কাপড় খুলে ফেলা, কুসুমগরম পানিতে গোসল, গোসলের সাবান, ত্বকের উপযোগী লোশন বা জলপাই তেল লাগানোর মতো কাজে শিশুকে গুছিয়ে দিতে সাহায্য করুন।

নবজাতকের বাড়তি যত্নঃ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, ‘নবজাতকের বয়স ১৫ দিন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের তেল, লোশন, পাউডার লাগানো ঠিক নয়। ১৫ দিন বয়স পার হওয়ার পর শিশুর ত্বকে জলপাই তেল লাগানো শুরু করতে পারেন। তবে সেটিও দিনে এক থেকে দুবারের বেশি নয়। জলপাই তেলের বদলে নারকেল তেলও লাগানো যেতে পারে।’

তোফাজ্জল হোসেন আরও বলেন, শিশুকে জন্মের তিন দিনের মধ্যে গোসল করানো ঠিক নয়। যেসব শিশু পূর্ণ গর্ভকাল পেরিয়ে জন্মেছে, তাদের এক দিন পর পর গোসল করানো যেতে পারে। তবে যেসব শিশু পূর্ণ গর্ভকাল পার হওয়ার আগেই জন্মেছে অথবা যাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম, তাদের সপ্তাহে ১ থেকে ২ দিন গোসল করাতে হবে। গোসলের আগে বা পরে তেল মালিশ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শীতে নবজাতকের চুল কাটা একেবারেই উচিত নয়। মূলত জন্মের ২ থেকে ৩ মাস পার হলে চুল কাটানো উচিত।

শিশুর জন্মের ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে কিছু র‍্যাশ উঠতে দেখা যায়। এই সময়ে র‍্যাশ ছাড়া শিশুর অন্য কোনো সমস্যা থাকে না। এটিকে অনেকে মাসি-পিসি রোগ বলে থাকেন। এতে ভয় পাওয়র কিছু নেই। ধীরে ধীরে র‍্যাশ ভালো হয়ে যায়।

এ সময় নবজাতকের ত্বকে একধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে দেখা যায়। নবজাতকের ত্বকে ছোট ছোট গোটা (যেগুলোতে পুঁজ জমে থাকে) দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, এ সমস্যার চিকিত্সা শুরু করতে দেরি হলে পরবর্তী সময়েতে পুরো শরীরে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে গিয়ে শিশু মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। নাভি পাকলে মানে নাভি থেকে পুঁজ পড়লে, দুর্গন্ধ ছড়ালে কিংবা নাভির চারপাশ লাল হয়ে গেলেও চিকিত্সা নিতে দেরি করবেন না। নাভিতে এমন মারাত্মক সংক্রমণ এড়াতে শিশুর জন্মের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৭ দশমিক ১ শতাংশ ক্লোরহেক্সিডিন লাগানোর কর্মসূচি শুরু হয়েছে সারা দেশেই। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র একবার এ দ্রবণটি নাভিতে লাগিয়ে দিতে হয় এবং নাভিতে লেগে থাকা বাড়তি দ্রবণ মুছে ফেলতে হয় না।

সরিষার তেল নয়ঃ
সরিষার তেল শিশুর জন্য একেবারেই ভালো নয়, এমনটাই জানালেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুর ত্বকের অস্বস্তিকর অনুভূতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সরিষার তেল। তাই এ তেল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। অনেকে শিশুর ঠান্ডা লাগলে সরিষার তেল ব্যবহার করেন। এমনকি নাকে প্রয়োগ করেন। এমন কাজ কখনোই করবেন না। নাকের মাধ্যমে শ্বাসনালিতে এ তেল ঢুকে গিয়ে শিশুদের মারাত্মক ধরনের নিউমোনিয়া হতে পারে বলে জানালেন অধ্যাপক সাঈদা আনোয়ার।

About নওরীন জাহান

View all posts by নওরীন জাহান →