চোখের কিছু সাধারন সমস্যা যা আপনার অন্ধত্ব্যের কারন হতে পারে

allhealthtipsbd-চোখ

চোখের নানা সমস্যার মধ্যে আজ আমরা চোখের এমন কিছু সাধারন সমস্যা সম্পর্কে জানব, যা কিনা খুবই সামান্য মনে হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে  তা পরবর্তী সময়ে খুবই মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে। এমন কি আপনাকে এই সুন্দর পৃথিবী দেখার আনন্দ থেকেও বঞ্চিত করতে পারে।

চোখের বিভিন্ন সমস্যা

  • চোখ টেরা সমস্যা
  • চক্ষুগোলকের বাইরের সমস্যা
  • ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা
  • উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা
  • ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যা
  • চোখের আঘাতজনিত সমস্যা

চোখ টেরা সমস্যা

চোখের মাংসপেশি চোখকে একটি নির্দিষ্ট দিকে অবস্থন করতে সাহায্য করে। মাংসপেশির সহায়তায় আমরা চোখকে এদিক সেদিক নাড়াতে পারি। কোনো কারণে কোনো মাংসপেশি দুর্বল হয়ে গেলে উল্টো দিকে বেঁকে যায়। একে টেরা চোখ বলে।

চোখের ক্যান্সার যেমন রেটিনেব্লাসটোমার প্রাথমিক অবস্থায় শিশুদের চোখ টেরা হয়ে যেতে পারে।

মাংসপেশির রোগ, স্নায়ুরোগ, আঘাত ইত্যাদি কারণে চোখ টেরা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিস্বল্পতার জন্য চোখ টেরা হতে পারে আবার টেরা হওয়ার জন্য দৃষ্টি স্বল্পতা এবং অলস চোখ(অসনষুড়ঢ়রধ) হযে যেতে পারে।

একটি জিনিসকে দু’টি দেখা, দৃষ্টিস্বল্পতা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি টেরা চোখের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। প্রাথমিকভাবে মাঝে মাঝে চোখ টেরা হলেও আস্তে আস্তে তা স্থায়ী রূপ নেয়।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
চিকিৎসার ক্ষেত্রে টেরা চোখের কারণ ও ধরন বের করা জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে দৃষ্টি ত্বরিত চিকিৎসা জরুরি। চশমা দিযে দৃষ্টিস্বল্পতা দুর করে শিশুদের অনেক টেরা চোখ সোজা করা যায়।

কিছু চোখের ব্যয়ামের ম্যধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় টেরা চোখের চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে। দৃষ্টিকটু বিধায় বাঁকা চোখের স্থায়ী চিকিৎসা হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনকে বেছে নেয়া হয়।

টেরা চোখের রোগীদের নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ ও চোখের পরীক্ষা করিয়ে নেয়া ভালো।

চক্ষুগোলকের বাইরের সমস্যা

চক্ষুগোলকের বাইরের রোগ বলতে আমরা যত ধরনের রোগ দেখে থাকি তা হল-

  • ব্লফারাইটিস,
  • টোসিস,
  • চেখের অঞ্জলি,
  • মেওয়া

১। ব্লফারাইটিসঃ
এটি হলো আইলিড বা চোখের পাপড়িতে অবস্থিত চুলের চুলকানি,. আলোতে চোখ বন্ধ হয়ে আসা, চোখে জালাপোড়া করা ইত্যাদিও অনুভূতি হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
ডাক্তারের পরামর্শে চোখের নিয়মিত পরিচর্যা (যেমন- মাথার খুশকিও চোখের চুলের গোড়া পরিষ্কার করা) ও ঔষধ সেবনে এ রোগের বার বার আক্রমণ রোধ করা সম্ভব।

২। টোসিসঃ
এটি হলো চোখের মাংসপেশির রোগ। এতে চোখে পাতা নিচে নেমে যায়। আঘাত, স্নায়ু দুর্বলতা,বার্ধক্যজনিত কারণে এ রোগ হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
সমস্যা খুব বেশি হলে অপারেশনের মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা সম্ভব।

৩।চেখের অঞ্জলি ঃ
এটি চোখের চুলের গোড়ায় অবস্থিত জিস বা মোল গ্রস্থির প্রদাহ। এতে প্রন্থির নিঃসরণ জমে ইনফেশন হয়ে ফুলে ওঠে। এতে প্রচন্ড ব্যথা হয়ে চোখের লিড ও চুলের গোড়া ফুলে যায়।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
ডাক্তারের পরামর্শে গরম সেক ও ঔষধ ব্যবহারে এ রোগ ভালো হয়। বার বারযাদের অঞ্জলি হয় তাদের ডায়াবেটিসের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত।

৪। মেওয়াঃ
চোখের পাতার ভিতর ব্যথাবিহীন টিউমারের মতো ফুলে যায়। এটি চোখের পাতার ভিতর অবস্থিত মিবোমিয়ান গ্রন্থির দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
অপারেশনের মাধ্যমে এর চিকিঃসা করা যায়। বারবার মেওয়া দৃষ্টি স্বল্পতার কারণেও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দৃষ্টি পরীক্ষা এবং স্বল্পতা থাকলে চশমা দেয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা

চোখের এ সমস্যায় ডায়াবেটিস রোগীদের মাঝে অহরহ যে সমস্যা দেখা যায় সেটি হল ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি জটিলতা।এ ক্ষেত্রে রেটিনার রক্তনালিকাগুলোতে সমস্যা দেখা দেয় ।

টাইপওয়ান এবং টাইপ টু ডায়াবেটিসে যদি দীর্ঘ সময় ধরে ব্লাড সুগার বেশি থাকে তবে চোখের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে।চোখের এ সমস্যায় বিশেষ করে চোখের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালিকা ভেঙে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
চোখের এ সমস্যায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুবই জরুরী।ডাক্তারের পরামর্শে  ঔষধ ব্যবহারে এ রোগ ভালো হয়।

উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা

উচ্চ রক্তচাপের কারণে যেমন হৃদ্রোগ হতে পারে, কিডনি বিকল হতে পারে, তেমনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে আপনার চোখ।  একে বলা হয় হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি। সারা বিশ্বে মানুষের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার বা অন্ধত্বের একটি বড় কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ।উচ্চ রক্তচাপের কারণে আপনার চোখের যে সমস্যা হচ্ছে—

১।অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণে আপনার চোখের পেছনের ক্ষুদ্র রক্তনািলগুলোতে পরিবর্তন হতে থাকে।
২।প্রথমে রক্তনািলগুলো সরু ও চিকন হয়ে যায়,
৩।চোখের পেছনে রেটিনায় তরল বের হয়ে আসে,
৪।রক্তক্ষরণ হতে পারে, অপটিক¯স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং
৫।অবশেষে দৃষ্টিশক্তি রহিত হয়।
৬।সামান্য চোখের সমস্যা বা মাঝেমধ্যে মাথাব্যথা হতে পারে।প্রায় অনেক দূর পর্যন্ত রোগী কোনো সমস্যাই অনুভব করেন না, একমাত্র নিয়মিত চোখের পরীক্ষা-িনরীক্ষার মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো ধরা পড়ে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
রেটিনা বা অপটিক স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসার তেমন সুযোগ থাকে না। তাই এর মূল চিকিৎসাই হলো প্রতিরোধ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই চিকিৎসা। তাই মধ্যবয়স পেরিয়ে গেলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং বেশি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা লবণ এড়িয়ে চলুন।

চর্বি-তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে সবজি-ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান। উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির আধিক্য থাকলে তাঁদের ঝুঁকি আরও বেশি। তাই ওগুলোও নিয়মিত পরীক্ষা করান। বছরে একবার কি দুবার চোখ পরীক্ষা করান। কেবল চশমার পাওয়ার নয়, চোখের সার্বিক পরীক্ষা জরুরি।

ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যা

শিশুদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি।আমাদের দেশে শিশুদের অন্ধত্বের অন্যতম কারন এটি। অপুষ্টিজনিত কারনে ভিটামিন “এ” এর অভাবে চোখের কালো রাজা প্রথমে শুকিয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে আলসার হয়ে যায়।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
ভিটামিনের অভাব দূর করতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন জাতিয় খাবার খেতে হবে।বেশি বশি ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত খাবার খেতে হবে।অভশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

চোখের আঘাতজনিত সমস্যা

চোখের আঘাতজনিত সমস্যার মধ্যে মায়োপিয়া অন্যতম। মায়োপিয়াতে চোখের আকার বড় হওয়ার কারণে চোখের দেয়াল পাতলা হয়ে যায়। সে জন্য সামান্য আঘাতেই চেখে অনেক মারাত্যক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ
মায়োপিয়া রোগীদের সব সময় চোখের আঘাত থেকে সাবধান থাকতে হবে এবং নিয়মিতভাবে ডাক্তারের পরামর্শে চোখের পাওয়ার পরীক্ষা এবং রেটিনার পরীক্ষা করিয়ে নেয়া ভালো।

চোখে দেখতে না পাওয়া মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ১৮ লক্ষ লোক অন্ধ যার প্রধান কারণ হিসেবে উপরোক্ত কারণগুলি দায়ী। সুতরাং আমাদের উচিত এই সকল চোখের সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যাওয়া। চোখের সমস্যায় সচেতন হওয়া এবং চোখের প্রতি যত্নবান হওয়া আমাদের সকলের একান্ত কাম্য।

About ডক্টর নাসরিন সুলতানা

Asscociate Professor, Dept. of Gynae & Obs, Shaheed Tazuddin Ahmad Medical College & Hospital ,Gazipur Gynaecology and Obstetrics (Pregnancy, Menstrual, Uterus, Female)

View all posts by ডক্টর নাসরিন সুলতানা →