চোখের মারাত্মক ৬টি সমস্যা ও তার সমাধান

allhealthtipsbd-চোখের সমস্যা

চোখ একটি স্পর্শকাতর সংবেদনশীল অঙ্গ, যার সাহায্যে  আমরা এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাই, তার রূপ উপভোগ করি। তাই চোখের সমস্যা একটি বড় সমস্যা।আল্লাহ মানুষকে চোখ দিয়েছে দেখার জন্য। দুই নম্বর হলো সৌন্দর্যের জন্য। চোখ না থাকলে সৌন্দর্য কমে যাবে। দুটোর জায়গায় যদি তিনটি দিত, তাহলেও সৌন্দর্য ভিন্ন রকম হতো।

তাই চোখ অনেক মূল্যবান সম্পদ এবং চোখের সমস্যা একটি বড় সমস্যা।সময় থাকতে চোখের চিকিৎসা না করলে কত ক্ষতি হতে পারে তা আমরা কখনও চিন্তাও করিনা। তাই আজ আমরা চোখের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করব।

চোখের মারাত্মক ৬টি সমস্যা 

প্রথমেই আমরা জানবো চোখের কি কি সমস্যা হয়ে থাকে। সাধারণত চোখের যে সমস্যাগুলো আমরা দেখতে পাই শেগুলো হল-

  • চোখের ছানিপড়া সমস্যা
  • দৃষ্টি শক্তি সমস্যা
  • নেত্রনালী প্রদাহ সমস্যা
  • কর্ণিয়ার আলসার বা চোখের ঘা সমস্যা
  • গ্লুকোমা সমস্যা
  • ইউভিয়াইটিস সমস্যা

চোখের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান

চোখের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি।এখন আমরা জানবো সেই সব সমস্যার সমাধান সম্পর্কে।উপরে উল্লেক্ষিত সমস্যা গুলোর প্রাথমিক কিছু সমাধা নিম্নে আলোচনা করা হল-

চোখের ছানিপড়া সমস্যাঃ

চোখে ছানি পড়া সমস্যাটা মূলত কি?এটা হল চোখের কর্ণিয়া ও আইরিসের পিছনে অবস্থিত স্বচ্ছ লেন্স বার্ধক্য জনিত কারণে এবং অন্যান্য কারণে অস্বচ্ছ হয়। এই স্বচ্ছ লেন্স অস্বচ্ছ হওয়াকেই ছানিপাড়া রোগ বলে।

যে সমস্ত কারণে চোখে ছানি পড়ে তা হলো

  • বয়স জনিত কারণে
  • আঘাত জতি কারণে
  • ডায়াবেটিস রোগের কারণে
  • ইউভিআইটিস রোগের কারণে
  • অনিয়ন্ত্রিত ষ্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে

ছানি রোগের লক্ষণগুলো কি হতে পারে?

ধীরে ধীরে দৃষ্টি ক্ষমতা লোপ পাওয়া, চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হওয়া , আলোর চাদিকে রংধনু দেখা, একটি জিনিসকে দুই বা ততোধিক দেখা, দৃষ্টি সীমানায় কালোদ দাগ দেখা, আলোতে চোখ জাপসা হয়ে আসা ইত্যাদি।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

কোন ঔষধ সেবনে ছানি রোগের প্রতিকার হয় না। অপারেশনের মাধ্যমে ছানি রোগের চিকিৎসা করতে হয়।সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে পুরোনো ছানি পেকে চোখে ব্যথা হতে পারে। শিমুদেও ক্ষেত্রে ছানি রোগের কারণে চোখ টেরা হয়ে যেতে পারে।

দৃষ্টি শক্তি সমস্যারঃ

দৃষ্টি শক্তি সমস্যায় রোগির কিকি ধরনে  দৃষ্টি শক্তি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে-

  • প্রেসবাইওপিয়া
  • মায়োপিয়া
  • অ্যাসটিগমেটিজম

 ১।প্রেসবাইওপিয়াঃ
ইহা চোখের কোন রোগ নয়। চল্লিশ অথবা তদুর্ধ বয়সে, বয়স জনিত কারণে চোখের গঠন গত পরিবর্তন হয়। চোখের লেন্সের স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পায়। ফলে কাছে দেখার জন্য লেন্সের আকার পরিবর্তনের ক্ষমতা কমে যায় এবং উক্ত বয়সে কাছে জিনিস ঝাপসা দেখায়।.

২।অ্যাসটিগমেটিজমঃ
এটি এক ধরনের দৃষ্টি স্বল্পতা, যাতে রোগীর কর্ণিয়ার যেকোনো এক দিকে (লম্বা দিকে, প্রস্থে অথবা কোণাকুণি) পাওয়ার পরবর্তন হয় বলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, এর কারনে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা একটি জিনিসকে দু’টি দেখা এবং মাথাব্যথা হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

সিলিন্ডার লেন্স ব্যবহারে এ সমস্যার সমাধান হয়।

 ৩।মায়োপিয়াঃ
এ ধরনের রোগীরা কাছে মোটামোটি ভালো দেখতে পারলেও দূরে ঝাপসা দেখে, তাই এদের ক্ষীণদৃষ্টি বলা হয়।  যাদের চোখের ছয় ডায়াপটারের বেশি মাইনাস পাওয়ারের লেন্স লাগে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে চোখের পাওয়ারও বাড়তে থাকে, তখন তাকে প্যাথজিক্যাল মায়োপিয়া বলা হয়। সে ক্ষেত্রে চোখের দেয়াল বা স্কে¬রা পাতলা হয়ে যায় এবং রেটিনায় ছিদ্র সৃষ্টি হয়ে পরবর্তীকালে রেটিনা আলাদা হয়ে গিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

অবতল লেন্স বা মাইনাস পাওয়ারের চশমা পরলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

 নেত্রনালী প্রদাহ সমস্যাঃ

নেত্রনালী প্রদাহ, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটা বেশ সাধারণ রোগ।এতে রোগী যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়-

১।এতে সব সময় চোখ থেকে পানি পড়ে এবং চোকের কোণায় চাপ দিলে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হয়।
২।বারবার নালী বন্ধ হয়ে চোখের পানি যেখানে জমা থাকে তা ফুলে যায় এবং জীবাণু সংক্রমণের কারণে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ৩।এটি খুবই ছোঁয়াচে রোগ, যাতে চোখে অনেক পিচুটি জমে, চোখ লাল হয় এবং ফুলে ওঠে। একজন থেকে আশপাশের সবার মাঝে ছড়াতে পারে।
৪।এটি ভাইরাসজনিত রোগ যাতে পরবর্তী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

রোদে সানগ্লাস ব্যবহার করা, ডাক্তারের পরামর্শ মতো ঘনঘন এন্টিবায়োটিক ড্র্রপ দেয়া এবং চোখের পরিচর্যা করলে এ রোগ দীর্ঘায়িত হয় না।
মনে রাখতে হবে, এই রোগের সাথে মাঝেমাঝে চোখের কর্ণিয়া বা কালো রাজার প্রদাহ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যথা-বেদনাও হতে পাওে, এমতাবস্থায় চক্ষু চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ ব্যতীত চোখে ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়।

এন্টিবায়োটিক সেবনে এ রোগ সাময়িকভাবে ভালো হলেও বারবার হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে ডিসিআর (উঈজ) অপারেশনের মাধমে নেত্রনালীর সাথে অন্য আর একটি পথে নাকের যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। এতে রোগীর পানি পড়া বন্ধ হয়।

কর্ণিয়ার আলসার বা চোখের ঘা সমস্যাঃ

কর্ণিয়ার আলসার বা চোখের ঘা, শ্রমজীবি মানুষের কাছেএটা বেশ সাধারণ রোগ।
কৃষি প্রধান এই দেশে অন্ধত্বের অন্যতম কারণ চোখের ঘা বা কর্ণিয়ার আলসার। এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে । আঘাত জনিত কারণ হলো প্রধান। সাধারণত ধান কাটার মৌসুমে ধানের ধারালো পাতা দিয়ে চোখের আঘাতের পর কর্ণিয়াতে ঘা হয়।  এছাড়াও কোনো কারণে চোখে জীবাণুর সরাসরি সংক্রমণেও আলসার বা ঘা হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

অবশ্যই কাজের সময় সানগ্লাস ব্যবহার করা, ডাক্তারের পরামর্শ মতো ঘনঘন এন্টিবায়োটিক ড্র্রপ দেয়া এবং চোখের পরিচর্যা করা।
সে ক্ষেত্রে ব্যথা-বেদনাও হতে পাওে, এমতাবস্থায় চক্ষু চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ ব্যতীত চোখে ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়।অপারেশনের মাধমেও এর সমাধান সম্ভব।

গ্লুকোমা সমস্যা

গ্লুকোমা হলো বাংলাদেশ তথা পৃথিবীতে অনিবারণযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।এতে রোগী যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা হল-

১।এটা চোখের এমন একটি রোগ, যাতে চোখের চাপ বেড়ে গিয়ে, পেছনের স্নায়ু অকার্যকর হয়ে ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি চলে যায়।
২।যেকোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। জন্মের সময় বেশ বড় চোখে এবং উচ্চ চক্ষুচাপ নিয়ে জন্মালে, একে কনজেনিটাল গ্লুকোমা বা জন্মাগত উচ্চ রক্তচাপ বলে।
৩।তরুণ বয়সেও হতে পারে, একে বলে জুভেনাইল গ্লুকোমা।
৪।বেশির ভাগ গ্লুকোমা রোগ ৪০ বছরের পর হয়। এদের প্রাথমিক গ্লুকোমা বলে।
৫।বেশি বয়সজনিত চোখের গঠনে পরিবর্তন, জন্মগত গঠনের ক্রটি, আঘাত, চোখ লাল হওয়া, ডায়াবেটিসজনিত চোখের রক্তহীনতা, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরয়েড বা হরমোন থেরাপি, ছানি পেকে যাওয়া ইত্যাদি কারণে গ্লুকোমা হতে পারে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

স্বাভাবিক চোখের চাপ(১০-২১) মি.মি. মার্কারি। অস্বাভাবিক চোখের চাপ থাকলে সমস্ত পরীক্ষার মাধ্যমে গ্লুকোমা শনাক্ত করে ত্বরিত চিকিৎসা বাঞ্চনীয়।

ইউভিয়াইটিস সমস্যা

চোখের পুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রক্তনালী পূর্ণ একটি স্তর বা লেয়ার আছে, যাকে ইউভিয়া বা ভাসকুলার কোট বলা হয়। এই ভাসকুলার কোটের প্রদাহকে ইউভাইটিস বলা হয়।

১।চোখে আঘাত, জীবাণুর সংক্রমন, কানেকটিভ টিস্যু বা যোজককলার রোগ ইত্যাদি কারণে এ রোগ হতে পারে।
২।চোখে ব্যথা, চোখ লাল হওয়া, আলোতে না যেতে পারা, মাথাব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ হতে পারে।
৩।কানেকটিভ টিস্যু রোগ, বাতরোগ, ফুসফুসের রোগ, কিডনিরোগ তথা যৌন রোগের সাথেও এ রোগের উপস্থাপন হতে পারে।
৪।শিশুদের ক্ষেত্রে রোগের লক্ষন অনেক দেরিতে বোঝা যায় বলে রোগ জটিলরূপ ধারণ করে।

সমাধান বা চিকিৎসাঃ

ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এই রোগে ত্বরিত চিকিৎসা প্রয়োজন।প্রয়োজনে মেডিসিন রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এ রোগের ফলে ছানি রোগ, চোখের উচ্চচাপ রোগ (গ্লুকোমা), রেটিনার রোগ ইত্যাদি কারণে চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ হোমাট্রপিন অথবা এট্রোপিন আইড্রপ যা দু-তিন বার ব্যবহার করে ব্যথা এবং প্রদাহ দু’টিই কমে। রোগের উপসর্গ এবং উপস্থাপনভেদে স্টেরয়েড এবং এন্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।এট্রোপিন আইড্রপ ব্যবহারের ফলে রোগী সাময়িক ঝাপসা দেখলেও পরবর্তীকালে ঔষধ বন্ধ করলে আবার ঠিক হয়ে যায়।

অবশ্যই শরীরের অন্যান্য রোগের (যার সঙ্গে ইফভিয়াইটিস রোগের সম্পর্ক রয়েছে) চিকিৎসা করাতে হবে।   ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো ঔষধ দেয়া বা বন্ধ করা যাবেনা এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।মনে রাখতে হবে, ত্বরিত চিকিৎসায় এ রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়।

About ডক্টর নাসরিন সুলতানা

Asscociate Professor, Dept. of Gynae & Obs, Shaheed Tazuddin Ahmad Medical College & Hospital ,Gazipur Gynaecology and Obstetrics (Pregnancy, Menstrual, Uterus, Female)

View all posts by ডক্টর নাসরিন সুলতানা →